জঙ্গিবাদ নির্মূল কীভাবে সম্ভব? কার দ্বারা সম্ভব?
মোহাম্মদ আসাদ আলী
ধর্মবিশ্বাস হচ্ছে এমন একটি বিষয় যাকে পাশ্চাত্য দর্শনগুলো যতই অস্বীকার করতে চাইছে, কার্যক্ষেত্রে ততই সে ধর্মের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। অর্থাৎ শত চেষ্টা করেও, বহু মতবাদ-শিক্ষাব্যবস্থা-গণমাধ্যম, হাজার হাজার লেখকের লেখনিও ধর্মবিশ্বাসকে নিঃশেষ করতে পারে নি। বিশেষ করে প্রাচ্যে ধর্মবিশ্বাসই রাজনীতি ও সমাজের প্রধান ইস্যু। একে অস্বীকার করা আর উটপাখির মতো বালিতে মাথা গুঁজে থাকা একই কথা।
আমি বাংলাদেশের কথাই বলি। এখানে ১৫ কোটি মানুষ ইসলাম ধর্মবিশ্বাসী। তাদের মধ্যে নাস্তিকের সংখ্যা খুবই কম। তবে ১৫ কোটিই যে ধার্মিক তাও নয়। এর যুব সমাজ ধর্ম থেকে অনেকটা নিরাসক্ত কারণ প্রচলিত ধর্মের অপ্রয়োজনীয়তা ও ক্ষতিকর দিকগুলো তাদের চোখে ধরা পড়ছে। কিন্তু তারাও এতটুকু অনুভূতি রাখে যে আল্লাহ ও রসুলকে কেউ কদর্য ভাষায় গালাগালি করলে তারাও ভিতরে ভিতরে ফুসে ওঠে।
এসময় কোনো গোষ্ঠী যদি তাদেরকে প্রণোদিত (Motivate) করে যে, ইসলামের শত্র“ কাফের মুরতাদদের হত্যা করে ফেল। এটাই তোমার জেহাদ। এটা করতে গিয়ে নিহত হলে তুমি শহীদ, পরকালে জান্নাত নিশ্চিত। তাহলে সেই যুবকদের মধ্যে একটি অংশ কনভিন্সড হবে এটা খুবই সরল কথা।
এখন ঐ যুবকদের যদি আপনি ফেরাতে চান তাহলে কী দিয়ে ফেরাবেন? ঘটনা ঘটানোর আগে তো পুলিশ টেরই পাবে না। পুলিশ যদি ধরেও ফেলে তাদেরকে সেজন্য কি ঐ যুবকরা নিজেদেরকে অপরাধী মনে করবে, অনুতপ্ত হবে, নাকি নিজেদের সফল মনে করবে? যদি তাদেরকে ফাঁসিও দেওয়া হয় তাদের এই ফাসি কি আরো বহু যুবককে ইসলামের জন্য প্রাণদানে অনুপ্রাণিত করবে না?
তাহলে পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে, ফাসি দিয়ে জেল দিয়ে কী লাভ হলো, জঙ্গিবাদ তো আরো বাড়তেই থাকবে এর দ্বারা? বরং তারা আরো কৌশলী ও বেপরোয়া হয়ে উঠবে। এমতাবস্থায় জঙ্গিবাদ নির্মূল কীভাবে সম্ভব? যুদ্ধ করেও তো যুক্তরাষ্ট্র ও তার জোট জঙ্গিবাদ নির্মূল করতে পারছে না। তারা কিছু মানুষ হত্যা করতে পারছে কিন্তু আদর্শ থেকে যাচ্ছে।
এখন একটাই পথ, জঙ্গিবাদ নামক বিকৃত আদর্শকেই হত্যা করতে হবে। সেজন্য লাগবে সেই আদর্শ থেকে শক্তিশালী আরেকটি আদর্শ যা জঙ্গিবাদকে অসার প্রতিপন্ন করে দেবে। যারা জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত তাদের সামনে প্রমাণ করতে হবে যে, ঐ পথে আদৌ জান্নাতে যাওয়া যাবে না, কারণ আল্লাহ ও রসুলের প্রদর্শিত পথ ওটা নয়। বরং তারা দুনিয়াও হারাচ্ছেন, আখেরাতও হারাচ্ছেন। তাদের দ্বারা মানবজাতির কোনো উপকার হচ্ছে না, বরং ক্ষতিই হচ্ছে।
এটা প্রমাণ করতে পারে একমাত্র হেযবুত তওহীদ, সুতরাং জঙ্গিবাদ নির্মূলে হেযবুত তওহীদের কোনো বিকল্প বর্তমানে এই পৃথিবীতে নেই।
জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যারা আদর্শিক লড়াই চালানোর পক্ষে মত দেন এমন ব্যক্তিবর্গ এবং সরকারের কর্তাব্যক্তিরা যখন কথায় কথায় বলেন, ‘ইসলাম শান্তির ধর্ম, এই ধর্মে জঙ্গিবাদের স্থান নেই, জঙ্গিদের কোনো ধর্ম নেই’ তখন তাদের মুখে কথাগুলো জঙ্গিদের কাছে হয়তো হাস্যকর বলেই মনে হয়। তারা জঙ্গিবাদকে কী মনে করেন তা তারাই ভালো বলতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো- ইসলাম শান্তির ধর্ম, শুধু এটুকু বলে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আদর্শিক লড়াই চালানো যাবে না। তারা যে অর্থে ইসলামকে শান্তির ধর্ম বলে থাকেন ইসলাম সেই অর্থে শান্তির ধর্ম নয়। ইসলাম এমন এক ধর্ম, যা অন্যায়, অবিচার, অনাচার ও অসত্যের বিরুদ্ধে সার্বক্ষণিক লড়াই করার অনুপ্রেরণা যোগায়। অন্যায়, অবিচার দেখে মুখ বুজে বসে থাকার নাম ইসলাম নয়। কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে এই লড়াই চালানোরও কিছু মৌলিক নীতিমালা আল্লাহ দিয়েছেন, যার ব্যত্যয় ঘটলে উল্টো ইসলামই অশান্তির কারণ হয়ে দাড়াতে পারে। আজ জঙ্গিরা সেই নীতিমালা ভঙ্গের দোষে দুষ্ট। কাজেই জঙ্গিবাদ থেকে জাতিকে রক্ষা করতে চাইলে এভাবে নয়, আরও গভীরে প্রবেশ করে, প্রকৃত ইসলামের জেহাদ সম্পর্কিত নীতিমালা ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য বিষয়গুলো প্রচার করতে হবে।
জঙ্গিরা ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করছে। ভালো কথা। কিন্তু তাদের কাছে যেটা আছে সেটা কি আদৌ প্রকৃত ইসলাম? ওই ইসলাম সারা পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা হলেও কি চূড়ান্ত শান্তি আসবে? না, জঙ্গিরা প্রকৃত ইসলামের ধারক নয়, কেন নয়, কীভাবে নয়, তাহলে কোনটা প্রকৃত ইসলাম, এ প্রশ্নগুলোর জবাব দিতে হবে তাকেই, যিনি জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামবেন। তাছাড়া প্রকৃত ইসলাম হলেই কি সেটাকে প্রতিষ্ঠা করতে সন্ত্রাসের আশ্রয় নিতে হবে? বোমাবাজী করতে হবে? ভিন্নমতাবলম্বীকে হত্যা করতে হবে? তাও নয়, কেন নয়- জবাব দিতে হবে তারও। সরকারের কাছে এসবের কোনো সদুত্তর নেই- এ কারণেই কি আদর্শিক লড়াই শুরু করতে সরকারের এত অনীহা?
আমাদের সরকার যতই বলুক, বাংলাদেশকে জঙ্গিবাদী রাষ্ট্র হতে দেয়া যাবে না, বাস্তবতা কিন্তু সেদিকেই যাচ্ছে। অন্যদিকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকেও শোনা যাচ্ছে এক ভয়ানক সতর্কবার্তা। বাংলাদেশের জঙ্গিরা নিয়ন্ত্রণে আছে, তবে নির্মূল সম্ভব নয়- গোয়েন্দা কর্মকর্তার এই বক্তব্য সকলেই শুনেছেন নিশ্চয়ই।
জঙ্গিবাদ দমনের দুইটি পদ্ধতি রয়েছে, শক্তি প্রয়োগ ও আদর্শিক মোকাবেলা। তৃতীয় কোনো পদ্ধতি নেই। সরকারকে বলব- শক্তি প্রয়োগ অনেক করেছেন। নির্মূল হয় নি। হবেও না। কেননা, যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তিধর রাষ্ট্রও শক্তি প্রয়োগের নীতিতে সফল হতে পারে নি। বাংলাদেশ নিশ্চয়ই যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি সামরিক শক্তিধর দেশ নয়। তাহলে উপায় এখন একটাই- আদর্শিক মোকাবেলা। তরিকত ফেডারেশন, তাবলীগ জামাত বা ইসলামী ফাউন্ডেশন দিয়ে ওটা হবে না। তেমন কোনো চেষ্টা যদি সরকার করে থাকে তাহলে তার অসারতা নিশ্চয়ই এতদিনে বুঝে গেছে। এক অন্ধ আরেক অন্ধকে পথ দেখাবে কী করে? কাজেই ওসব বেতনভোগী ধর্মজীবীদের বাদ দিয়ে প্রকৃতপক্ষেই যারা জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে শক্ত তথ্য, প্রমাণ, যুক্তি হাজির করে জঙ্গিবাদকে ভুল প্রমাণ করতে পারবে এবং একই সাথে মুসলিম জাতির করণীয় ঠিক করে দিতে পারবে তাদের শরণাপন্ন হতে হবে। তা না করে ‘ইসলাম শান্তির ধর্ম’, ‘ইসলামে মানুষ হত্যা পাপ’- ইত্যাদি বহুল প্রচলিত প্রবচন আউড়িয়ে জঙ্গিবাদের অগ্রগতি বন্ধ করা সম্ভব নয়।
মন্তব্য সমূহ (0)
আপনার মতামত দিন
ক্যাটাগরি সমূহ
জনপ্রিয় নিবন্ধ
-
যে সভ্যতা তেলা মাথায় তেল দেয় ওই সভ্যতাকে ঘৃণা...
27 Aug, 2015 -
দাঙ্গাকারীদের স্বর্গ নেই
22 Jan, 2016 -
আসুন জান্নাতের রাস্তা চিনে নিই
28 Dec, 2017 -
ইসলাম কীভাবে দাসত্বপ্রথাকে নির্মূল করেছে?
22 Nov, 2023 -
স্বরুপকাঠিতে হেযবুত তওহীদের সংবাদ সম্মেলন
28 Sep, 2019
সাম্প্রতিক নিবন্ধ
-
বিপুল নারী-পুরুষের অংশগ্রহণে উত্তরায় ঈদুল আজহ...
28 May, 2026 -
উত্তরায় সাংবাদিকদের নিয়ে হেযবুত তওহীদের গোলটে...
16 May, 2026 -
শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে একমাত্র...
01 May, 2026 -
শ্রমিকের অধিকার ও মাদকমুক্ত সমাজ গঠন ‘নৈতিক জ...
01 May, 2026 -
শ্রমিকের ঘাম নিয়ে ওয়াজ ও রাজনীতি : রিয়াদুল হা...
01 May, 2026
বর্তমানে কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!