জনতার প্রশ্ন আমাদের উত্তর
প্রশ্ন: ইসলাম ধর্মে মদ্যপান নিষিদ্ধ, মদের ব্যবসা করা হারাম। আবার অনেক ধর্মে এটা বৈধ। এখন আপনারা যদি বাংলাদেশে আপনাদের মতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন তখন আপনারা কী করবেন?
উত্তর: আল্লাহ যে বিষয়গুলো নিষিদ্ধ করেছেন তা মান্য করলে প্রতিটা ব্যক্তি উপকৃত হবে। মো’মেন-মুসলিমরা আল্লাহর হুকুম যত বেশি মান্য করবে জান্নাতে তার অবস্থান তত বেশি সমুন্নত হবে, আল্লাহর নিকট সে তত বেশি সম্মানিত হবে। আমরা আল্লাহর হুকুমের উপর মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করছি, আমরা স্বভাবতই মানুষকে আল্লাহর আদেশ মেনে চলতে উৎসাহিত করব এবং নিষিদ্ধ কাজগুলোর ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করব। কিন্তু কখনোই রাষ্ট্র বা কোনো ব্যক্তি ধর্মের কোনো বিষয়ে অন্যের উপর জবরদস্তি করতে পারবে না এটা ইসলামের নীতি। কেউ যদি ব্যক্তিগতভাবে আল্লাহর একটা হুকুম অমান্য করে তাহলে তার শাস্তি আল্লাহ দিবেন কিন্তু রাষ্ট্র কেবল সামাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণ চিন্তা করবে, প্রতিটা মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করবে। কাজেই কেউ যদি নিজের বাড়িতে বসে মদ খায়, খেয়ে চুর হয়ে পড়ে থাকে, রাষ্ট্র সে ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করবে না। কিন্তু ঐ পানীয় পান করে যদি সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়, অন্যের শান্তি ভঙ্গ করা হয় তবে তা অবশ্যই নিয়ন্ত্রণযোগ্য কারণ এখানে অন্যের অধিকারের প্রশ্ন। কোনো খাদ্য আল্লাহ হালাল করেছেন, কোনোটা হারাম করেছেন। কেউ যদি না মানে সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। রসুলাল্লাহ বলেছেন, ঐ দেহ জান্নাতে যাবে না, যা হারাম দ্বারা পরিপুষ্ট হয়েছে। জান্নাত আল্লাহর, সেখানে কে যাবে কে যাবে না এটা আল্লাহ আর বান্দার ব্যাপার। সেখানে আর কারো এখতিয়ার নেই। আমরা শুধু দেখব কেউ যেন কারো হক নষ্ট করতে না পারে।
এটি হচ্ছে ব্যক্তি স্বাধীনতার বিষয়। কিন্তু যে বস্তুর দ্বারা মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেই বস্তুর বিজ্ঞাপন প্রচার করা, রাষ্ট্রীয়ভাবে তার উৎপাদন ও বাজারজাতকরণকে বৈধতা দেওয়া কেনোক্রমেই চলতে পারে না। আজকের দিনে আমরা দেখি সিগারেটের প্যাকেটে লেখা থাকে, ধূমপান মৃত্যু ঘটায়, ধূমপান ক্যান্সারের কারণ, ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ইত্যাদি, কিন্তু রাষ্ট্র এর উৎপাদন ও বাজারজাতকরণকে অবৈধ করে না। তাহলে একে কল্যাণ রাষ্ট্র কী করে বলব?
বর্তমানের রাষ্ট্রকাঠামো এমন একটি পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে যে রাষ্ট্রকাঠামোর অন্যতম জরুরী উপাদান সরকার এখন বেশ কিছু বিষয়ে পুঁজিবাদী একটি শ্রেণির হাতে বন্দী। প্রতিটি সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে সরকারকে সেই পুুঁজিবাদী শ্রেণিটির স্বার্থের দিকটি বিবেচনায় আনতে হয়। কিন্তু সত্য প্রতিষ্ঠিত হলে রাষ্ট্র কখনই নির্দিষ্ট কোন শ্রেণির হাতে বন্দী থাকবে না। রাষ্ট্রের মূল কর্তব্যই হবে ন্যায় তথা জনগণের সার্বিক কল্যাণ। রাষ্ট্র প্রতিটি সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে জনগণের সার্বিক কল্যাণের কথা চিন্তা করবে। ধরুন আলু দিয়ে চিপস তৈরি করে বাজারজাত করার অনুমতি চেয়ে কেউ সরকারের কাছে আবেদন জানালো। তখন সরকার প্রথমে মেডিক্যাল রিপোর্টের মাধ্যমে সেই পণ্যের ফলে জনগণের কোন স্বাস্থ্য ঝুঁকির সম্ভাবনা রয়েছে কিনা সে ব্যাপারে নিশ্চিত হবে এবং এরপর সেই পণ্যকে বাজারজাত করার বৈধতা দেবে। যদি উক্ত পণ্য দ্বারা জনগণের কোন অকল্যাণের সম্ভাবনা থাকে তবে রাষ্ট্র কখনই সেই পণ্য বাজারজাত করার অনুমতি দিবে না। রাষ্ট্র হবে স্বাধীন, কোন শ্রেণির নিকট জিম্মি থাকবে না। মাদকের বেলাতেও একই কথা। মাদকদ্রব্য যেহেতু ক্ষতিকর তাই সরকার একে বাজারজাত করা দূরে থাক বাণিজ্যিকীকরণ, উৎপাদন ও আমাদানিও করতে দিবে না। এখানে কে হিন্দু, কে মুসলমান, কার ধর্মগ্রন্থে কী আছে সেটা কোনো বিবেচ্য বিষয় না। আইনের চোখে সব ধর্মের মানুষই সমান। রাষ্ট্র জনগণের সার্বিক কল্যাণের মূলনীতির উপর দণ্ডায়মান থাকবে।
বর্তমানের প্রচলিত আইনের কথা যদি বলি তবে হেলমেট ছাড়া মোটরবাইক চালালে জরিমানা গুনতে হয়। এখন যদি কোন ব্যক্তি বলে আমি হেলমেট পড়বো না, আমার ক্ষতি আমি করবো তাতে রাষ্ট্রের কী? কিন্তু রাষ্ট্র তা কখনই মেনে নিবে না। জনগণের সার্বিক কল্যাণের কথা বিবেচনা করেই রাষ্ট্র এই আইন প্রণয়ন করেছে। হেলমেট ছাড়া বাইক চালানোর ফলে সে নিজেকে শুধু ঝুঁকির মধ্যে রাখছে তাই নয় সে রাষ্ট্রকেও ঝুঁকির মধ্যে রাখছে কারণ রাষ্ট্র তার সার্বিক তত্ত্বাবধায়কও বটে। রাষ্ট্র মাদকের লাইসেন্স প্রদানে বাধ্য হয় কারণ মাদকের ব্যবসা যারা করে সরকার সেই ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর হাতে বন্দী। তখন রাষ্ট্র তার মূলনীতি ভুলে যায়।
প্রশ্ন: আপনারা যে কাজ করছেন তা প্রশংসনীয় কিন্তু মসজিদ মাদ্রাসায় করছেন না কেন?
উত্তর: আমরা মসজিদ মাদ্রাসায় কাজ করছি না, এটা সম্পূর্ণ সত্য নয়। বেশ কিছু মাদ্রাসায় আমরা প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠান করেছি। পত্রিকা তো যাচ্ছেই। কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে এড়িয়ে কাজ করা আমাদের নীতি নয়। আমরা আমাদের কর্মকাণ্ডে সর্বশ্রেণির মানুষের সম্পৃক্ততা আশা করি। মসজিদের ইমাম, খতিব, বিভিন্ন মাদ্রাসার প্রধান এরকম অনেক আলেমদেরকে নিয়ে আমরা রাজধানীতে আলোচনা অনুষ্ঠান করেছি। অনেক আলেম আমাদের সাথে ঐক্যবদ্ধও হচ্ছেন।
আসলে বর্তমানে মানুষের মনে ইসলাম সম্পর্কে ধারণা হচ্ছে, ইসলাম মানেই দাড়ি, টুপি, মসজিদ, মাদ্রাসা, আলেম ওলামা, সুর করে কোর’আন তেলাওয়াত, আযান দেয়া, হজ্জ করা ইত্যাদি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ইসলাম শব্দের অর্থ হলো শান্তি অর্থাৎ ন্যায়বিচার, ঐক্য, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, শৃংখলা, আনুগত্য, কোথাও অভাব নেই, অনটন নেই, দুঃখ নেই, যন্ত্রণা নেই এমন একটা পরিস্থিতির নাম ইসলাম। ১৬ কোটি বাঙালি কেবল মসজিদ মাদ্রাসায় থাকে না। তারা প্রেসক্লাবে থাকে, উপাসনালয়ে থাকে, সিনেমা হলে থাকে, সংসদে থাকে, ঘরে থাকে, তারা হাটে থাকে, বাজারে থাকে, রাস্তাঘাটে সর্বত্র থাকে। মানুষ যেখানে আছে সেখানেই সত্য পৌঁছানো আমাদের কর্তব্য। এ কারণে আমরা সবজায়গাতেই কাজ করার চেষ্টা করি। আমরা মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে গ্রাম-পাড়া-মহল্লা পর্যন্ত সর্বত্র কাজ করার চেষ্টা করছি।
তবে বাস্তবতা হলো- মসজিদ মাদ্রাসায় যারা থাকেন তাদের অধিকাংশের জীবিকার মাধ্যম হলো ধর্ম অর্থাৎ তারা ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করেন যা মহান আল্লাহ সম্পূর্ণভাবে নিষেধ করেছেন। আমরা ধর্মব্যবসায়ীদের মুখোশ উন্মোচন করে দিচ্ছি। এ কারণে ধর্মব্যবসায়ীরা আমাদের কাজে সহযোগিতা করা দূরে থাক, গত ২৩ বছর ধরে ঘোর বিরোধিতা করে আসছে। এখনও তারা আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা কথা বলে মানুষকে ক্ষেপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। তথাপিও আমরা আশাবাদী যে সত্যনিষ্ঠ আলেমদের সহযোগিতা পেলে মাদ্রাসার ছাত্রদের সঙ্গে ব্যাপক আকারে কাজ করার ক্ষেত্র প্রস্তুত হবে।
[উত্তর দিয়েছেন রাকিব আল হাসান, সাহিত্য সম্পাদক, হেযবুত তওহীদ]
মন্তব্য সমূহ (0)
আপনার মতামত দিন
ক্যাটাগরি সমূহ
জনপ্রিয় নিবন্ধ
-
যে সভ্যতা তেলা মাথায় তেল দেয় ওই সভ্যতাকে ঘৃণা...
27 Aug, 2015 -
দাঙ্গাকারীদের স্বর্গ নেই
22 Jan, 2016 -
আসুন জান্নাতের রাস্তা চিনে নিই
28 Dec, 2017 -
ইসলাম কীভাবে দাসত্বপ্রথাকে নির্মূল করেছে?
22 Nov, 2023 -
স্বরুপকাঠিতে হেযবুত তওহীদের সংবাদ সম্মেলন
28 Sep, 2019
সাম্প্রতিক নিবন্ধ
-
বিপুল নারী-পুরুষের অংশগ্রহণে উত্তরায় ঈদুল আজহ...
28 May, 2026 -
উত্তরায় সাংবাদিকদের নিয়ে হেযবুত তওহীদের গোলটে...
16 May, 2026 -
শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে একমাত্র...
01 May, 2026 -
শ্রমিকের অধিকার ও মাদকমুক্ত সমাজ গঠন ‘নৈতিক জ...
01 May, 2026 -
শ্রমিকের ঘাম নিয়ে ওয়াজ ও রাজনীতি : রিয়াদুল হা...
01 May, 2026
বর্তমানে কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!