বিশ্লেষণ: জন কেরিদের গণতন্ত্র ন্যায়নীতির প্রশ্নে পুরোটাই ব্যর্থ
আবু সাফওয়ান:
ক্রিমিয়ার অধিকাংশ জনগণ ইউক্রেন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রাশিয়ার সাথে একীভূত হওয়ার জন্য যে গণভোট সম্পন্ন করেছে তার বিরোধিতা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয়ানগণ রাশিয়ার প্রতি কঠোর সমালোচনা এবং এ ভোটপ্রক্রিয়াকে অবৈধ আখ্যা দিয়েছে। প্রতিক্রিয়াস্বরূপ তারা রাশিয়ার অনেক নেতার উপর ভিসা ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। একই সাথে ক্রিমিয়ার এই সিদ্ধান্তে সহযোগিতা ও প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখার কারণে রাশিয়াকে বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনার কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। গত মঙ্গলবার মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরে এক বক্তব্যে তিনি বলেন, “রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার সঙ্গে একীভূত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছেন এবং এজন্য তাকে ‘মূল্য’ দিতে হবে (বাংলাদেশ প্রতিদিন অনলাইন)” যদিও ভদিমির পুতিনের নেতৃত্বাধীন রাশিয়া পশ্চিমাদের এসব হুমকি-ধামকিকে থোরাই পাত্তা দিচ্ছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে ভোটের মাধ্যমে স্বায়ত্বশাসিত ক্রিমিয়ার অধিকাংশ জনগণ নিজেদের চাওয়া পাওয়ার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে তাকে পশ্চিমারা কেন এবং কোন যুক্তিতে অবৈধ আখ্যা দিতে পারে? বিশেষ করে পশ্চিমা সভ্যতা যখন সেই একই গণতন্ত্র ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য বিশ্বের অপরাপর অগণতান্ত্রিক দেশগুলোর উপর সামরিক বাহিনী প্রেরণ করে নারী-শিশুসহ সাধারণ ও নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করে! তাদের সেই পছন্দনীয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতির ভোট ব্যবস্থার উপর আশ্রয় করে ক্রিমিয়া যখন রাশিয়ার সাথে একীভূত হতে চায় এবং বিশেষ করে তাদের অধিকাংশ জনগণই যখন জাতিগতভাবে রাশিয়ান, তখন তাদের এই প্রচেষ্টা দোষনীয় এবং কেন অবৈধ হতে যাবে? তাহলে পশ্চিমাদের সত্যিকার নীতি কী মানুষের কাছে সে প্রশ্ন উঠাটাই কি স্বাভাবিক নয়?
প্রকৃত অর্থেই পশ্চিমা বিশ্ব আদর্শ বিবর্জিত। নিজেদের সামরিক আধিপত্য, সর্বদা অন্যদেরকে দাবিয়ে রাখার প্রচেষ্টা, তাদের সামনে কাউকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না দেওয়া এবং নিজেদের অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ই তাদের একমাত্র আদর্শ। যদি তা-ই না হবে তাহলে কি করে সৌদি আরবের বুকে যুগের পর যুগ ধরে নির্বিঘেœ রাজতন্ত্র চলতে পারে? কেনই বা রাজতন্ত্রের ‘কিং’দের সাথে তাদের এত সখ্যতা? কেনই বা মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড সরকার সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের ভোট পেয়ে ক্ষমতায় গিয়েও সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপে ক্ষমতাচ্যুত হয় আর সেই সেনা শাসকদেরকে মার্কিন যুক্তরাষ্টসহ তাদের অন্যান্য দোসরগণ অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়ে যায়? এক্ষেত্রে তখন কোথায় যায় তাদের গণতন্ত্র, কোথায় যায় জনগণের ভোটের অধিকার? কই, ইরাক আক্রমণের সময় তারাতো গণতন্ত্র মান্য করেনি! বিশ্ব জনমতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সেখানে আক্রমণ করে দেশটিকে ভস্মে পরিণত করা যদি বৈধতা পায়, তবে তা না করে গণভোটের মাধ্যমে কোন ইচ্ছের প্রতিফলন ঘটানো অবৈধ হবে কেন? আজকে ভদ্রতার মুখোশধারী ব্রিটিশগণ মুখে মুখে গণতন্ত্র, ভোটের অধিকার ফেরি করে বেড়ান। কই, দু’শো বছর যখন তারা আমাদেরকে পদানত করে গোলাম করে রেখেছিল, একটি বারের জন্যও কি তারা আমাদের মতামত নিতে ভোটের ব্যবস্থা করেছে? উল্টো তারা বন্দুকের নল আর চাবুকের জোরেই শাসন-শোষণ করে আমাদের সম্পদ জাহাজে করে নিয়ে নিজেদের দেশকে সমৃদ্ধ করেছে। আমাদেরকে করে গেছে নিঃস্ব। অনেক কিছুর মতই ছিনিয়ে নেওয়া আমাদের সম্পদের মধ্যে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ হীরকখণ্ড কোহিনূর ব্রিটেনের রানীর মুকুটে শোভা পাচ্ছে।
তারা যদি সত্যিকার অর্থেই গণতন্ত্র মানে, গণতন্ত্র বিশ্বাস করে তাহলে তাদের উচিত নয় ক্রিমিয়ার অধিকাংশ জনগণের মতামতকে সম্মান জানানো? জন কেরিদের গণতন্ত্রের ব্যর্থতা এখানেই যে, এরা সত্যকে সত্য বলে দেখে না, সত্য বলে মানতে পারে না। স্বার্থের প্রশ্নে আদর্শের জলাঞ্জলি দিতে এরা মোটেও কুন্ঠিত হয় না। তবে পাঠককে এ কথা মনে করার দরকার নেই যে আমি ক্রিমিয়া এবং রাশিয়ার স্তুতি গাইতে এই লেখার অবতারণা করেছি। কেননা রাশিয়া আজকে যে গণভোটের দোহাই দিয়ে ক্রিমিয়াকে বগল দাবা করেছে তারা কিন্তু তাদেরই অন্তর্ভুক্ত অনেক স্বায়ত্বশাসিত কিংবা আংশিক স্বায়ত্বশাসিত জাতিগোষ্ঠীর দাবির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে না। এদের মধ্যে চেচনিয়া, দাগেস্তান দীর্ঘ দিন যাবত মুক্তির সংগ্রাম করে, লাখে লাখে প্রাণ দিয়েও স্বাধীনতা পাচ্ছে না। সামরিক শক্তির বিশাল ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও তারা রুশ সেনাবাহিনীর মুখোমুখি দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু কই, ক্রিমিয়ার গণদাবির প্রতি অতিশয় সম্মান প্রদর্শনকারী পুতিনের দেশতো চেচনিয়া, দাগেস্তানের মানুষকে একটিবারও ভোটের মাধ্যমে তাদের মতামত প্রকাশ করার সুযোগ করে দেয়নি! অথচ ক্রিমিয়ার ক্ষেত্রে একটি মাস যাওয়ার আগেই কত দ্রুততার সাথে সবকিছু হয়ে গেল। মূলত এরা উভয়েই নিজেদের স্বার্থের প্রশ্ন অন্ধ, আদর্শভ্রষ্ট। গণতন্ত্রের ব্যর্থতা এখানেই যে, এখানে জনতার নামে সব জায়েজ হয়ে যায়, এমনকি সেটা অন্যায়-অযৌক্তিক হলেও। আর ইসলামী সভ্যতার সফলতা এখানেই যে, যা হক, সত্য এবং ন্যায় তা দুনিয়ার মানুষ না মানলেও সেটা সত্য বলেই গৃহিত হবে। পৃথিবীর বুকে এই নীতি যতদিন না প্রতিষ্ঠিত না হবে ততদিন পৃথিবীর বুক থেকে দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার, দরিদ্রের উপর ধনীর বঞ্চনা, শোষণ ও শাসিতের উপর শোষকের অবিচার নির্মূল হবে না। জন কেরি, বারাক হুসেন ওবামা, ভাদিমির পুতিন কিংবা ব্রিটেনের রাজা-রানীরা এ ব্যাপারে বরাবরই ব্যর্থ হয়েছেন। জনতার রায়ের নামে পৃথিবীতে অনাচার করে চলছেন। নীতি- আদর্শকে প্রাধান্য না দেওয়ার কারণেই মানুষের রক্ত ঝড়িয়ে সম্পদ আহরণ এমকি লুট করা হীরক খণ্ড দিয়ে নিজেদের মুকুট সজ্জিত করতেও এরা লজ্জা বোধ করছেন না।
মন্তব্য সমূহ (0)
আপনার মতামত দিন
ক্যাটাগরি সমূহ
জনপ্রিয় নিবন্ধ
-
যে সভ্যতা তেলা মাথায় তেল দেয় ওই সভ্যতাকে ঘৃণা...
27 Aug, 2015 -
দাঙ্গাকারীদের স্বর্গ নেই
22 Jan, 2016 -
আসুন জান্নাতের রাস্তা চিনে নিই
28 Dec, 2017 -
ধর্মব্যবসায়ী ও পাশ্চাত্যদের ষড়যন্ত্র: ধর্মীয়...
21 May, 2015 -
ইসলাম কীভাবে দাসত্বপ্রথাকে নির্মূল করেছে?
22 Nov, 2023
সাম্প্রতিক নিবন্ধ
-
বিপুল নারী-পুরুষের অংশগ্রহণে উত্তরায় ঈদুল আজহ...
28 May, 2026 -
উত্তরায় সাংবাদিকদের নিয়ে হেযবুত তওহীদের গোলটে...
16 May, 2026 -
শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে একমাত্র...
01 May, 2026 -
শ্রমিকের অধিকার ও মাদকমুক্ত সমাজ গঠন ‘নৈতিক জ...
01 May, 2026 -
শ্রমিকের ঘাম নিয়ে ওয়াজ ও রাজনীতি : রিয়াদুল হা...
01 May, 2026
বর্তমানে কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!