নিবন্ধ ও সম্পাদকীয়

মে’রাজ বিজ্ঞানের আলোকে

31 May, 2018 Super Admin 299 ভিউ
মে’রাজ বিজ্ঞানের আলোকে

মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী
মে’রাজ শব্দের আক্ষরিক অর্থ ঊর্দ্ধারোহণ। কিন্তু মুসলিমদের জন্য এই শব্দটি একটি বিশেষ ঘটনাকে নির্দিষ্ট করে বোঝায়। সংক্ষেপে তা হচ্ছে: বিশ্বনবী মোহাম্মদ রাসুলুল্লাহর (দ.) জীবনের কোন এক সময় মালায়েক জিব্রাঈল (আ.) তাঁকে আল্লাহর কাছে নিয়ে যান। আল্লাহর দরবারে আল্লাহর সঙ্গে তাঁর দেখা হয়, কথাবার্তা হয় এবং তারপর জিব্রাঈল (আ.) তাঁকে আবার পৃথিবীতে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। এই ঘটনাটি পবিত্র কোর’আনে উল্লেখ করা আছে।
কোন তাফসীরকারক বলেছেন- ঘটনা সত্যিই, তবে হয়েছে স্বপ্নে। কেউ বলেছেন, তাঁর আত্মা ঊর্দ্ধারোহণ (মে’রাজ) করে আত্মার চক্ষু দিয়ে আল্লাহকে দেখে এসেছেন। আর কেউ বলেছেন, তিনি স্বশরীরে গিয়েছেন এবং স্বশরীরে ফিরে এসেছেন।
কোর’আনের ব্যাখ্যাকারদের মধ্যে এই যে দ্বিধা এর কারণ হলো মে’রাজের ঘটনা বুঝতে হলে বিজ্ঞানের যে জ্ঞানের প্রয়োজন তা মে’রাজের ঘটনার সময় সমসাময়িক মানুষের ছিল না এবং তারপর যারা কোর’আনের তফসীর বা ব্যাখ্যা করেছেন তাদেরও ছিল না। আমরা বর্তমানে মসলা-মাসায়েলের ব্যাপারে শিক্ষিত যে শ্রেণীর লোকদের আলেম বলি তাঁদেরও বিজ্ঞানের সে জ্ঞান নাই যাতে তারা মে’রাজের ঘটনা বুঝতে পারেন- তারা বিশ্বাস করেন ঠিকই, কিন্তু তা অন্ধ বিশ্বাস। বিজ্ঞান আজ পর্যন্ত যতটুক অগ্রসর হয়েছে তাতে মে’রাজের ঘটনাটাকে আংশিক বোঝা যাচ্ছে- ভবিষ্যতে বিজ্ঞানের যতই অগ্রগতি হবে ক্রমশঃই মে’রাজের ঘটনা ততই বোঝা যেতে থাকবে। এ পর্যন্ত বিজ্ঞান যতটা আবিষ্কার করতে পেরেছে সেই আলোকে পবিত্র মে’রাজ যতটুকু বোঝা যায় তার আলোচনা করবো। প্রথম কথা হচ্ছে ‘সময় এবং দূরত্ব’ (Time and space) এই দু’ই বিস্তৃতি (Dimension) সম্বন্ধে যার যথেষ্ট জ্ঞান নেই তার পক্ষে মে’রাজ বোঝা অসম্ভব।: আমি সম্পূর্ণ বুঝার কথা বলছি না- সম্পূর্ণ বুঝা যাবে ভবিষ্যতে, বিজ্ঞান আরও বহু অগ্রসর হবার আগে নয়। আমি বর্তমান পর্যন্ত বিজ্ঞান যতটুকু অগ্রসর হয়েছে মাত্র সেইটুকুর আলোকে মে’রাজের যে সামান্য অংশ আলোকিত হয়েছে তাই আলোচনা করব। বলেছি Dimension না বুঝলে মে’রাজ বোঝা অসম্ভব এবং Time and space, অন্ততঃ এ দুই বিস্তৃতি (Dimension) না বুঝলে মে’রাজ আংশিক ভাবেও বোঝা সম্ভব নয়। তাই আমরা এই দুই (Dimension) বোঝার চেষ্টা করবো। বিজ্ঞান বলছে যে, এই দৃশ্যমান মহাবিশ্ব কতগুলি বিস্তৃতির (Dimension) মধ্যে আবদ্ধ- তার মধ্যে দুটো হলো সময় (Time) এবং দূরত্ব (Space) । আমরা মানুষও এই দুই Dimension এর মধ্যে আবদ্ধ। যদি কোন মানুষ কোন উপায়ে নিজেকে এই সময়ের (Time) বাঁধন থেকে বিচ্ছিন্ন করে এর ঊর্দ্ধে উঠতে পারে তবে তার কাছে অন্তহীন অতীত (Past) এবং অন্তহীন ভবিষৎ ও বর্তমান (Present) হয়ে যাবে অর্থাৎ তার কাছে অতীত এবং ভবিষ্যৎ বলে কিছুই থাকবে না। সমস্তই তার কাছে বর্তমান। মনে হয় প্রাচীন হিন্দুদের এ সম্বন্ধে একটা ধারণা ছিল- কারণ তাদের কাছ থেকে ত্রিকালজ্ঞ পুরুষদের সম্বন্ধে শুনতে পাই।
অনুরূপভাবে যদি কেউ নিজেকে দূরত্বের (Space) বাঁধন থেকে মুক্ত করতে পারেন তবে তার কাছে দূরত্ব বলে কিছুই থাকবে না। কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের জিনিস এবং চক্ষুর সম্মুখে রাখা জিনিস তাঁর কাছে সমান দূর। মোট কথা দূর বলে তার কাছে কিছুই নেই। আর এই উভয় বিস্তৃতি (Dimension) থেকে যদি কেউ নিজেকে মুক্ত করতে পারে তবে তাঁর কাছে ‘দূর-নিকট-অতীত বর্তমান’ কিছুই নেই। সবই তাঁর সম্মুখে, সবই তাঁর কাছে বর্তমান।
বিজ্ঞানের এই আবিষ্কারের আলোকে আমরা যদি নতুন করে মে’রাজকে দেখি তবে কি পাই? মে’রাজের বিবরণে আমরা পাই যে, রসুলাল্লাহ (দ.)-কে আল্লাহর কাছে নিয়ে যেতে হযরত জিব্রাঈল (আ.) যে বাহনটি নিয়ে এসেছিলেন তার নাম তিনি বললেন, বোরাক। বিবরণে আমরা আরো পাচ্ছি যে, বোরাক বলে কোন জন্তু বা বাহনের নাম এর আগে কেউ শোনে নি-কেউ জানে নি। আরবি ভাষায় শব্দটির এই প্রথম ব্যবহার হলো। বিদ্যুৎ বা ইলিকট্রিসিটির (Electricity) আরবি হলো ‘বরক’। এই বরক থেকে আগত বোরাক শব্দটির অর্থ হলো বিদ্যুৎ জাতীয় বা বিদ্যুৎ সম্বন্ধীয় অর্থাৎ বৈদ্যুতিক। তার অর্থ হলো জিব্রাঈল (আ.) রসুলাল্লাহ (দ.) এর জন্য যে বাহনটিকে নিয়ে এসেছিলেন সেটা ছিল বৈদ্যুতিক অর্থাৎ তার গতি ছিল অন্ততঃ সেকেন্ডে ১,৮৬,২৭০ মাইল অর্থাৎ সর্বোচ্চ গতি The ultimate speed এই বাহনে করেই জিবরাঈল (আ.) রসুলাল্লাহ (দ.) কে আল্লাহর কাছে নিয়ে গেলেন।
মে’রাজের বিবরণে আরও পাচ্ছি যে, আল্লাহর সাথে দেখা করে, তাঁর সঙ্গে যা কথাবার্তা ছিল তা শেষ করে, সাততলা আসমানের বিভিন্ন তলায় বিভিন্ন নবী-রসুলদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাত করে, জান্নাত-জাহান্নাম দেখে, সৃষ্টির আরও সমস্ত কিছু ঘুরে-ফিরে দেখে যখন ঐ বোরাকে চড়েই এই পৃথিবীতে ফিরে এলেন, তখন দেখলেন যে, তিনি রওনা হবার আগে যে পানি দিয়ে অযু করে নিয়েছিলেন সে পানি তখনও গড়িয়ে যাচ্ছে। দরজার শিকল যেমন দুলছিল ঠিক তেমনি দুলছে। পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে যে, তিনি যে মুহূর্তে বোরাকে চড়ে রওনা হয়েছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই ফিরে এসেছিলেন- মধ্যে কোন সময় পার হয় নি।
রসুলাল্লাহকে (দ.) মে’রাজে নিয়ে যেয়ে তাঁর সাথে কথাবার্তা বলতে, আল্লাহকে কোন বৈজ্ঞানিক সত্য ভাঙ্গতে হয় নি বরং সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক উপায়ে তাঁর প্রেরিত প্রিয় বান্দাকে তিনি মে’রাজে অর্থাৎ ঊর্দ্ধারোহণে নিয়ে গিয়েছিলেন। পৃথিবীর ইতিহাসের ঠিক যে সময়টাকে, মানুষের জ্ঞানের বিবর্তনের যে মুহূর্তটায় আল্লাহ এ কাজটি করেছিলেন তখন মানুষ ততটুকু বিজ্ঞান আয়ত্ব করতে পারে নাই, যাতে সে বুঝতে পারে মে’রাজ কি? তাই ফিরে এসে রসুলাল্লাহকে কোনমতে প্রবোধ দিতে হয়েছে সাহাবীদের তাঁর বাহনকে ডানাওয়ালা ঘোড়ার মত কিছু একটা বলে। তিনি কি তখন তাঁদের বিদ্যুৎ আর Ultimate Speed বোঝাতে চেষ্টা করতেন?
তাহলে দেখা যাচ্ছে, আল্লাহ তাঁর প্রিয় রসুলকে জিবরাঈল (আ.) এবং সর্বোচ্চ গতিবিশিষ্ট বাহন দিয়ে সময় (Time) এবং দূরত্বের (Space) বিস্তৃতির বাইরে বা উর্দ্ধে নিয়ে গিয়েছিলেন। তখন সমস্ত গতি, সমস্ত সময় ছিল স্তব্ধ। তারপর তাঁর কাজ শেষ হবার পর তাঁকে সময় এবং দূরত্বের ঠিক যে বিন্দু থেকে উঠিয়ে নিয়ে ছিলেন ঠিক সেই বিন্দুতেই ফেরত দিয়েছিলেন। কাজেই হুজুর (দ.) ফিরে এসে দেখে ছিলেন এক মুহূর্ত সময় পার হয়নি। এবং আরও দেখা যাচ্ছে যে, তাঁর এই মে’রাজ সম্পূর্ণভাবে তাঁর পবিত্র শরীর নিয়েই হয়েছিল এবং বিজ্ঞানের সম্পূর্ণ নিয়মমাফিক হয়েছিল। শুধু বিজ্ঞান তখনও বিস্তৃতি এবং সর্বোচ্চ গতি আবিষ্কার করতে পারে নাই বলেই কারও পক্ষে মে’রাজ বোঝা সম্ভব ছিল না। তাই কোর’আনের তফসীরকারদের মধ্যে অনেকেই একদিকে বিশ্বাস অন্যদিকে আপাতঃ অসম্ভব এই দুয়ের টানা-হেঁচড়ায় একটা মাঝামাঝি আপস করতে চেষ্টা করে এই সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক, সম্পূর্ণ শারীরিক মে’রাজকে স্বপ্ন, ধ্যান, আত্মিক এমনকি শারীরিক ও আত্মিকের মাঝামাঝি এবটা অবস্থার কথা বলতে চেয়েছেন।
এ পর্যন্ত পবিত্র মে’রাজ যেটুকু বোঝা গেল তা আংশিক মাত্র। মে’রাজের বিবরণে আমরা আরও পাই এই যে, জিব্রাঈল (আ.) রসুলুল্লাহকে (দ.) বোরাকে চড়িয়ে আল্লাহর কাছে নিয়ে যেতে এক একে সাত আসমান পার হলেন। এই সাত আসমান সম্বন্ধে কোর’আন শরীফে কয়েকবার উল্লেখ আছে। এই সাত আসমান বুঝতে হলে যে জ্ঞান প্রয়োজন বিজ্ঞান (Science) আজও তা সম্পূর্ণ সংগ্রহ করতে পারে নি, নিঃসন্দেহে বলা যায় ভবিষ্যতে পারবে। এবং যখন পারবে তখন সাত আসমানের অর্থাৎ মহাশূন্যের বিভিন্ন স্তর সম্বন্ধে বুঝতে পারবে। যেমন করে বিস্তৃতির (Dimension) জ্ঞান লাভের পর বিজ্ঞান বুঝতে পারছে যে, ওজুর পানি বয়ে যাবার আগে, দরজার শিকল নড়া থামবার আগে কেমন করে মহাবিশ্ব ঘুরে আসা যায়।

মন্তব্য সমূহ (0)

বর্তমানে কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!

আপনার মতামত দিন